সকাল ১১:১২
ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তারেক সাক্ষাৎকার নিচ্ছেনথার্টিফার্স্ট নাইটে কোনো অনুষ্ঠান নয় : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীআজকের সংখ্যা ১৮/১১/১৮দিনাজপুরে তিনদিন ব্যাপী প্রাণ চিনিগুড়া চাল নবান্ন উৎসব পালিতআজকের সংখ্যা ১৫/১১/১৮সোয়া দুই কোটি টাকায় বিক্রি হলো আত্মহত্যার চিঠিপালিত হচ্ছে বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসনির্বাচন নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কূটনীতিক ব্রিফ বৃহস্পতিবারচাঁপাইনবাবগঞ্জে সম্প্রীতি বাংলাদেশের সমাবেশআজকের সংখ্যা ১৪/১১/১৮

মুক্তিযুদ্ধ ও সৎসঙ্গের অবদানে শহীদ বুদ্ধিজীবী প্যারী মোহন আদিত্য

ধৃতব্রত আদিত্য : ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর থেকে নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম। ১৯৪৮ সালে ভাষা-আন্দোলন, ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিমী লীগ গঠন, ১৯৫১ সালে পাকিস্তান গঠনতন্ত্রের খসড়া মুলনীতির বিরোধিতা, ১৯৫২ সালে ভায়া-আন্দোলনকারীদের আত্মাহুতি, ১৯৫৩ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠন, ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার বিজয়, ১৯৫৫ সালে আওয়ামীলীগের অসম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল হিসাবে আতœপ্রকাশ, ১৯৫৬ সালে স্বায়ত্বশাসনের দাবি ও সাংবিধানিক সংখ্যাসাম্যেও বিরোধিতা, ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের করালগ্রাস, ১৯৬২ সালে শিক্ষানীতি বিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের অনিরাপত্তাজনিত অবস্থা, ১৯৬৬ সালে ছয় দফা দাবি, ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালে ঘূর্ণিঝড়- পরবর্তী ত্রাণকাজে পাকিস্তান সরকারের অবহেলা ও সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের নিরন্কুশ বিজয় এবং ১৯৭১ সালে ৭ই মার্চের ভাষণ, ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা ঘোষনা এবং অবশেষে ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বিজয় অর্জিত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের সাংবিধানিক নাম হয় ” গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ”। টাঙ্গালের সৎসঙ্গ আশ্রমে সৎসঙ্গের অনেক কর্মী প্রতিটি আন্দোলনের সাথে ওতোপ্রোত ভাবে জড়িত ছিল। সৎসঙ্গ বাংলাদেশ আজও সেই স্মৃতি বহন করে চলছে।

১৯৫০ সালে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকুল চন্দ্রের আর্শীবাদে পাকুটিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় সৎসঙ্গ আশ্রম। যেখানে সবধর্ম মতবাদ আর বিশ^াসকে গুরুত্ব ও শ্রদ্ধার সাথে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে অস্ত্র, কন্ঠ, কলম, সেবা ও চিকিৎসা এবং গোপনে সংবাদ সংগ্রহের মাধ্যমে। এই যুদ্ধে আমার শ্রদ্ধেয় কাকা প্যারী মোহন আদিত্য ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দেন এবং ঝাপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে। তিনি কলমের মাধ্যমে এবং সেবার মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পথকে প্রসারিত করেছেন। মতাদর্শগত কারনে স্বাধীনতা বিরোধিরা ও কু-চক্রি কিছু মানুষ এই সৎসঙ্গ আশ্রমের মধ্যে ডাকাতি ও আগুন দেওয়ার মত ঘটনা ঘটিয়েছে। কেননা বাংলার নামটি এবং জাতিয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা চিতরে মুছে ফেলার ঘৃন্য অভিপ্রায় ছিলো তৎকালীন শাসক শ্রেণীর। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর কারনে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের সৎসঙ্গ আশ্রমে তাদের অনেক অভিপ্রায় সফল হয়নি।

প্রয়াত সৎসঙ্গ সম্পাদক রাস বিহারী আদিত্যের তত্তাবধানে বহু ঝড়-ঝাপটার মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান সৎসঙ্গের কাজ এগিয়ে চলছিল দ্রুত গতিতে। প্রতিটি কাজেই ছিল প্যারী মোহন আদিত্যের উল্লেখ যোগ্য ভ’মিকা। ১৯৬৩ তে বড় ধরনের চুড়ি, ১৯৬৪ তে ডাকাতি এবং ১৯৬৫ তে আশ্রম পোড়ানোর মত ঘটনার সম্মখিন হতে হয়েছে তাঁদের। ১৯৭০ সালে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও জলোচ্ছাস দেখা দিলে প্যারী মোহন আদিত্য মৃত্যুর মুখে পতিত হওয়া শত শত মানুষের সেবা করার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন। তাঁরই ধারাবহিকতায় ১৯৭১ সালে পাকিস্তান বাহিনীর বর্বোচিত হামলার পূর্বে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমারে ধানমন্ডী ৩২ নম্বর বাড়ীতে রাস বিহারী আদিত্য ও প্যারী মোহন আদিত্য দেখা করে কিছু অর্ঘ্য সৎসঙ্গের পক্ষে আপদ কালিন ফান্ডে দান করেন। আবেদন জানিয়ে ছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুরের জন্ম স্থান ও সৎসঙ্গ আশ্রম পরির্দনের জন্য। তাঁরা বেঁচে থাকলে হয়ত বঙ্গবন্ধু আসতেনও।

তৎকালীন পাকিস্তান গোষ্ঠিার নানা অবিচারকে কেন্দ্র করে এবং শ্রীশ্রীঠাকুরের শিষ্য হওয়ার পর থেকেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্যারী মোহন আদিত্যের মানসপটে তৈরী হয়েছিল। প্রথমত, অস্তিত্ব রক্ষা করার প্রশ্নে বাঙালীর মনে মক্তির চিন্তা আসে। দ্বিতীয়ত, ভাষা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে বাঙালী স্বাধীনতা চেয়েছে। তৃতীয়ত, মেধা, সম্পদ,সরকারী দায়িত্ব, কর্তৃত্বের অবমূল্যায়ন প্রতিরোধে এদেশের মানুষ মুক্তিকামী হয়েছে। চতুর্থত, বাঙালীদের প্রতি পাকিস্তানীদের অন্যায় আচারণ, অবিচার, নির্যাতন, শোষণ, নিপীড়ন, বাঙালীকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে। পঞ্চমত, তৎকালীন পাকিস্তানী গোষ্টি কর্তৃক বাঙালী মুসলমানদের চেয়ে সংখ্যালঘুরা অনেক বেশী নির্যানের শিকার। এ সব বিষয় রেখা পাত করে ছিল প্যারী মোহন আদিত্যের মনেও। তাই রুখে দাড়িঁয়ে ছিলো হানাদারদের বিরুদ্ধে। সেবা করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধাদের, আশ্রয় দিয়েছিলেন মুক্তিকামী মানুষদের। সে হিসেবে সৎসঙ্গ আশ্রম হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল।

পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর দৃষ্টি পড়ে যায় সৎসঙ্গ আশ্রমে। ১৮ এপ্রিল প্রথম বিপর্যয়ের শিকার। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই পাকিস্তান বাহিনীর মার্টারের গোলায় আশ্রমের মঠ ধ্বংস হয়ে যায়। তবে প্যারী মোহন আদিত্য মুল মন্দিরে ধ্যান অবস্থায় থাকায় তাঁকে মুর্ত্তি ভেবে গুলি করা থেকে বিরত থাকে। কিন্ত ২১মে ঘাতক দল ময়মনসিংহ যোওয়ার পথে পাকুটিয়ায় আক্রমন চালালে প্যারী মোহন আদিত্য ধরা পড়েন। অত্যাচারিত হন ঘাতকের ক্যাম্পে। আবার তিনি পালাতেও সক্ষম হন। কিন্তু ঘাতকরা হাল ছাড়ে নাই। অবশেষে ১৯৭১ এর ৮ আগষ্ট প্যারী মোহন আদিত্যকে প্রথমে গুলি করে ঝাঝড়া করে দেয় এবং পরে বেয়নেট দিয়ে খুচিঁয়ে খুচিঁয়ে হত্যা করে। পাকিস্তান হানাদার বাহিনী চলে গেলে রাস বিহারী আদিত্য এসে তাঁকে কোলে তুলে নেন। প্রায় তিন ঘন্টা পর সন্ধ্যা প্রার্থনা শেষে শেষ তিনি নিঃস্বাস ত্যাগ করেন।
মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের যন্ত্রণাকাতর মনের কান্না যেন স্পষ্ট শুনতে পাই আমি। বাব বার ফিরে গেছি সেই একাত্তরের দিনগুলোর দিকে। ভেসে উঠে চোখের সামনে মুক্তিযুদ্ধে নিহত শহীদদের বধ্যভ’মি। আশ্রমের ভিতর থেকে ২টি কন্ঠের কান্না, কামানের গোলাগুলির শব্দে সেদিন পাকুটিয়া গ্রাম সহ সৎসঙ্গ আশ্রমে বিরাজ করছিল ভুতুরে শ্মশান এবং কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছিল উপস্থিত সবাই।

সান্তনা পেয়েছি এই ভেবে ”আমরা তো গর্বিত, আমরা তো ভাগ্যবান”। কিন্তু নিজের জিবনের বিনিময়ে আমাদের স্বাধীন দেশ যারা দিয়ে গেলেন, তাঁরা? তাঁরা শুধু দিয়েই গিয়েছেন।
শহীদদের কথা, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের কথা অনেকেরই মনে আছে, আবার অনেকেরই মনে নেই। হয়তো বা আবছা মনে আছে। বড়দের কাছে গল্প শুনেছি। বাবার কাছ থেকে প্যারী কাকার কথা শুনে নিজের মত করে তাঁর ছবি তৈরী নিয়েছি। যত বারই ভেবেছি কাকাকে নিয়ে লিখব প্রত্যেকবারই এ মর্মবেদনা ছত্রে ছত্রে ব্যক্ত হয়েছে।

এই দেশের জন্য ত্রিশ লক্ষ মানুষ প্রাণ দিয়েছেন এবং দুই লক্ষ মা বোন সম্ভ্রম হারিয়েছেন- এ ত্যাগের মূল্য আমরা দিতে পারিনি। একবারের জন্যও কি আমরা ভেবেছি ? তাঁদের ত্যাগের বিনিময়েই এদেশ! পতাকায় ঐ লাল যে তাঁদেরই রক্ত। মাটিতে তাঁেদর রক্তের ঘ্রাণ, সৎসঙ্গ তপোবন বিদ্যালয়ের সামনে স্মৃতি ফলোকে তাঁদের নাম।

প্যারী মোহন আদিত্য সৎসঙ্গ কার্যকরি পরিষদের সদস্য এবং সৎসঙ্গ সংবাদ পত্রিকার সহ সম্পাদক ছিলেন। তিনি নাটক যাত্রা থেকে শুরু করে লৌহশিল্পের কাজও করতেন। ছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের আদর্শে মানবতার উপাসক।

প্যারী মোহন আদিত্য ও বামা চরন শর্মা সৎসঙ্গ আশ্রমেই থাকতেন। স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখে দুজনের নিভৃতে সময় কাটতো। দুজনে দুজনকে কাছ ছাড়া করতেন না। কি নিষ্ঠুর নিয়তি। ঘাতকরা দুজনকে এক সঙ্গেই হত্যা করে। দুজনের সমাধিও সেই একই জায়গায়।

লেখক:  সম্পাদক, সৎসঙ্গ বাংলাদেশ

Top