রাত ৪:৫৬
আগামী মাস থেকে এলএনজির সরবরাহ শুরু: নসরুল হামিদআম নয়, আঁটির উপকারিতা জেনে নিনদিল্লির নেতৃত্ব ছাড়লেন গৌতম গম্ভীরইউটিউব দেখে পার্সেল বোমা বানানো সেই শিক্ষক গ্রেফতারতারেকের বাংলাদেশি নাগরিকত্ব নেই : আইনমন্ত্রীছাত্রীকে এসিড ছোড়ার মামলায় একজনের যাবজ্জীবনপাসপোর্ট নিতে হলে অবশ্যই দেশে আসতে হবেতিনদিনের সফরে অস্ট্রেলিয়া পথে প্রধানমন্ত্রীরাষ্ট্রপতির টুঙ্গিপাড়া সফর স্থগিতবড়পুকুরিয়া কয়লাখনি শ্রমিক ও ক্ষতিগ্রস্তদের সংবাদ সম্মেলন

বাংলা নববর্ষ এবং ‘বছরের কিবা মানে’

তৌহীদ রেজা নুর: এখনো মনে গেঁথে আছে রঙিন মলাটের সেই বইটির কথা। সুসাহিত্যিক হায়াত মামুদ অনূদিত ভিল্লি ত্রুবকোভিচ এর অসাধারণ মন কাড়া রঙ্গিন ছবি দিয়ে ঠাসা ছিল সে বই। রুশ সাহিত্যিক সামুইল মার্সাকের শিশুদের জন্য লেখা বইখানার নাম ছিল একটু বিদঘুটেঃ ‘বছরের কিবা মানে?’ গভীর ও ওজনদার নাম সম্বলিত এই বইয়ের মাহাত্ম বোঝার বয়স নয় তখন। তখন শুধু পাতা উল্টে নানা রঙের ছবি দেখে যাওয়া আর ছড়ার মতো পংক্তিগুলো মুখস্ত করে তোতা পাখীর মতো আউড়ে চলাই ছিল কাজ। তবে লেখক স্বার্থক – কারণ বুঝুক চাই না বুঝুক – শিশু পাঠকের মনে তিনি পুরে দিতে পেরেছেন সময় নিয়ে কিছু গভীর বার্তা। এখনো তো তাই মনে করতে পারি সেই তিনটি দার্শনিক লাইন –
বছর কি কভু ঘুরে আসে ফের?
চলে সে সামনে –
পিছনে না যায়!
বাল্যকালে মুখস্ত হওয়া লাইন তিনটি মনের মাঝে দিব্যি আনকোরা রয়ে যাওয়াতে এখন বুঝি এ তো নিছক ছড়ার পংক্তি নয় – এ দেখি অতল গভীরতা নিয়ে মহাকালকে ধরার সচেতন আয়োজন!
দুই
পহেলা জানুয়ারী আসার প্রাক্কালে প্রতি বছর দেশে দেশে ‘হ্যাপী নিউ ইয়ার’ পালনের মহোৎসব শুরু হয়। এটি আমাদের স্বভাবজাত যে, নূতন কিছু এলে বা নূতন কিছু হলেই আমরা তা পালন করি। নূতনকে বরণ করি নানা আয়োজন করে। তাই বলা যায় নূতনকে বরণ করার রীতিটি নূতন নয়, বরং বহু পুরনো যা পালিত হয়ে আসছে সেই প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে। তবে পার্থক্য রয়েছে পালন করার আদলে। কোন কোন সমাজে তা পালিত হয় নাচ-গান, খাদ্য আর মদ্য পানের মধ্য দিয়ে, কোথাওবা পালিত হয় কৃষি বা জ্যোতির্বিদ্যার অংশ হিসেবে। প্রাচীন মিসরের নূতন বছর শুরু হোতো নীল নদে বন্যা হবার মধ্য দিয়ে। পারস্যবাসীর কাছে নববর্ষ আসে বসন্তের বার্তা নিয়ে। গ্রীসের নববর্ষ আসে শীতের সময়ে যখন সূর্য নিরক্ষরেখার দক্ষিনে সবচেয়ে দূরবর্তী অবস্থানে থাকে। চীনের নূতন বছর আসে আরেকটু বিলম্বে – যখন দক্ষিনে সূর্য নিরক্ষরেখার দূরতম অবস্থানে যাবার পরে দ্বিতীয়বার নূতন চাঁদ ওঠে গগণে।
জানা যায়, আজ থেকে চার হাজার বছর আগে প্রাচীন ব্যবিলনে বর্ষবরণের উৎসব পালিত হোতো। তবে তা ছিল মূলত ধর্ম এবং পৌরাণিক বিশ্বাস-নির্ভর। তাঁরা মনে করতো যে নূতন বছরে প্রকৃতি জগত একেবারে নূতনভাবে জন্মলাভ করে। তাই এই বিশেষ দিনটি পালন করা হোতো ব্যাপক ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। সকলে বিশ্বাস করতো যে পুরো জগত পরিশুদ্ধ হয়ে নূতনভাবে যেন জন্মলাভ করে এই দিনে – তাই বিগত দিনের সকল অশুচী, জীর্ণ, জরার অবসান ঘটিয়ে নববর্ষ আসে সবকিছুকে নূতনভাবে রাঙাতে।
প্রাচীন ব্যাবিলনে সাগরের দেবী তিয়ামাতকে পরাজিত করে আকাশের দেবতা মারদুকের বিজয়ের দিন হিসেবে পরিগণিত হোতো এই দিন। এই দিনের রাজনৈতিক তাৎপর্যও ছিল কারণ নূতন বছরের প্রথম দিনে হয় নূতন কোন রাজার অভিষেক হতো অথবা আরো সময় ধরে রাজ্য শাসন করতে পুরনো রাজার মেয়াদকাল নবায়ন করা হতো। এই সময়ে ব্যবিলনের একজন রাজাকে কঠিন এবং দারুণ অপমানজনক পরীক্ষার উত্তীর্ণ হয়ে তাঁর রাজাগিরি বজায় রাখতে হতো। কথিত আছে, নববর্ষের প্রথম দিনে রাজাকে মারদুক দেবতার সামনে এনে প্রজাকুলের উপস্থিতিতে সম্পূর্ণ নগ্ন করা হতো এবং তাঁকে অনবরত চড়-থাপ্পড় মারা হতো। এরপর তাঁর কান ধরে টানতে টানতে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নেয়া হতো যেন প্রচন্ড ব্যথায় তাঁর চোখে অশ্রু ঝরে। এইসব মহাকান্ড হবার সময় প্রজাকুল ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা করতো কখন হবু রাজার চোখ বেয়ে রাজসিক অশ্রু ঝরে তা দেখার জন্য। সত্যি সত্যি রাজার চোখ বেয়ে জল বেরিয়ে আসলে মনে করা হতো যে দেবতা মারদুক সন্তুষ্ট হয়েছেন তাঁর প্রতি যে কিনা রাজা হলে জনগণের কষ্ট অনুভব করতে পারবে। এবং রাজ্যের রাজা হিসেবে তাঁর অভিষেক অনুষ্ঠান পালিত হতো সেদিন।
রোমে নূতন বছর আসে বসন্ত কালে যখন পৃথিবী নামক গ্রহে দিন এবং রাতের সময়-দৈর্ঘ্য সমান হয় তখন। প্রাচীন রোমান ক্যালেন্ডারে বছরে মাস ছিল ১০ টি এবং ৩০৪ দিনে হতো এক বছর। যীশু খ্রিষ্ট জন্মাবার আট শতাব্দী আগে রোমান ক্যালেন্ডার তৈরি হয়েছিল। এই ক্যালেন্ডার সূর্য ঘড়ির সাথে মিলিয়ে চলতে না পারায় যীশুর জন্মের ৪৬ বছর আগে জুলিয়াস সিজার তাঁর সময়কার সবচেয়ে প্রসিদ্ধ জ্যোতির্বিদ এবং গণিতবিদদের সাথে আলাপ করে যথাযথ পরিবর্তন এনে নূতন সৌর ক্যালেন্ডারের প্রবর্তন করেন যা জুলিয়ান ক্যালেন্ডার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এই ক্যালেন্ডারটির সাথে বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের অনেক সাযুজ্য রয়েছে।
পরিবর্তনের অংশ হিসেবে সিজার জানুয়ারী মাসের ১ তারিখকে বছরের প্রথম দিন হিসেবে গ্রহণ করেন। মূলতঃ বিপরীত দিকে দুই মুখঅলা পরিবর্তন ও শুভ সূচনার রোমান দেবতা জানুস (Janus) এর কথা স্মরণে রেখে এই মাসকে প্রথম মাস হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। এই দুই মুখ একাধারে অতীত ও ভবিষ্যৎ দেখতে পায় এমন বিশ্বাস করতেন তাঁরা। তাই এক জানুয়ারী মাস থেকে আরেক জানুয়ারী আসা পর্যন্ত সময়কে এক বছর বিবেচনা করা হয়। জানুস দেবতার তুষ্টির জন্য নানা উদ্যোগ নেয় তাঁরা। আগামী বারোটি মাসের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে যতœ করে ঘর সাজায় লরেল পল্লব দিয়ে এবং খুব হুল্লোড় করা পার্টি করে। বন্ধু ও পাড়া-পড়শীরা নিজেদের মধ্যে ডুমুর ফল, মধু ও অন্যান্য উপহার বিনিময় করার পাশাপাশি শুভেচ্ছা জানায় একে অপরকে।
তিন
দেশে দেশে নানাভাবে বছরের প্রথম দিনটি পালিত হয়। আর পহেলা বৈশাখে আমরা বাঙালী জনগোষ্ঠী পালন করি বাংলা নববর্ষ। বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল তারিখে পালিত হয় এই বাংলা নববর্ষ। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরাসহ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে প্রতি বছর ১৪ অথবা ১৫ এপ্রিল এই দিনটি পালিত হয়। চান্দ্র-সৌর (lunisolar) বাংলা ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে এপ্রিলের ১৪ তারিখে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন নির্ধারণ কর হয়। আনন্দ মিছিল, মেলা এবং আপনজনের সাথে সময় কাটাবার মধ্য দিয়ে পালিত হয় দিনটি। নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় করে সকলে।
বাঙালী সংস্কৃতি মূলত মিশ্র সংস্কৃতি। অনেক সভ্যতা, বর্ণ এবং ধর্মের সম্মিলনে গড়ে উঠেছে এই সাংস্কৃতিক বন্ধন। পাশাপাশি সুদীর্ঘকাল থেকে গাঙ্গেয় সভ্যতার এই বাংলাভূমি কৃষি অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। কৃষি ভিত্তিক গ্রামীন সমাজের নানা প্রথা একজনকে আরেকের সাথে অদৃশ্য বন্ধনে যেন বেঁধে রেখেছে। কথিত আছে, বাঙালী সমাজে বারো মাসের তেরো পার্বণ। মূলতঃ হিন্দু ধর্মের পূজাকে কেন্দ্র করে এই কথাটি বলা হয়ে থাকে। যার ফলে বছরের প্রায় পুরোটি সময়ই থাকে উৎসবমুখর। অন্য দিকে মুসলিম সমাজে দুই ঈদকে কেন্দ্র করে যে ভ্রাতৃত্ববোধ এবং উদযাপনের আমেজ তৈরি হয় তা ‘ছোট বড় নাই ভেদাভেদ – সমান সবে আজি’ বারতাকেই ছড়িয়ে দেয় সমাজের এক প্রান্ত থেকে ওপর প্রান্তে। এদেশের খৃষ্টান এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা তাদের নানা ধর্মীয় উৎসবের আয়োজন করেন। সব মিলিয়ে অনাদিকাল থেকেই এই অঞ্চলের মানুষ সাম্প্রদায়িক সহাবস্থান করে আসছে। বাংলা নববর্ষ আমাদের সমাজের সকল ধর্মের, সকল বয়সের, সকল মানুষ উদযাপন করে নানাভাবে। তাতে এক ধরণের সাংস্কৃতিক আবহ তৈরী হয় দেশব্যাপী।
মঙ্গল শোভাযাত্রা বাংলা নববর্ষ পালনের একটি মুখ্য আয়োজন যা শুরু হয়েছিল ১৯৮৬ সাল থেকে। বাংলাদেশে তখন স্বৈরাচারী সামরিক শাসন চলছে। শ্বাসরুদ্ধকর ঐ পরিবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তদানীন্তন চারুকলা ইন্সটিটিউট-এর উদ্যোগে শুরু হয় এই মঙ্গল শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখে। রঙ-বেরঙের দারুণ সব মুখোশ ও ফিগার সমেত সমবেত হাজার হাজার মানুষের এই পদযাত্রা হতো জাতীয় জীবনে শান্তি ও মঙ্গলের অভিপ্রায়ে। যতই দিন এগিয়েছে – এই শোভাযাত্রার শোভা এবং পদযাত্রীর সংখ্যা বেড়েছে। এই স্বতঃস্ফূর্ত মঙ্গল শোভাযাত্রার সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অনুধাবন করে ২০১৬ সালে ইউনেস্কো এই শোভাযাত্রাকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে।
চার
বছরকে আমরা কখনো সন আবার কখনো সাল বলি। সন একটি আরবী শব্দ আর সাল ফারসী শব্দ। আনুষ্ঠানিকভাবে আমরা বাংলা বছরকে বলি বঙ্গাব্দ। এতে ধারণা করা যায় যে বাংলা ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করেছিলেন কোন মুসলিম রাজা বা সুলতান।
মুঘল আমলে হিজরী সন অনুযায়ী বাঙালী প্রজাদের কাছ থেকে ভূমির খাজনা আদায় করার রেও্য়াজ ছিল। চাঁদের অবস্থান অনুযায়ী হিজরী সন হিসেব করার কারণে কৃষির মৌসুমের সাথে মিলিয়ে খাজনা আদায় করা সম্ভব হতো না। শোনা যায়, স¤্রাট আকবর নাকি খাজনা প্রদানের সমস্যা দূর করতে বাংলা ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে পহেলা বৈশাখে বাংলা নূতন বছরের প্রথম দিন গণনা শুরু করেন। বাংলা বছরকে বঙ্গাব্দও বলা হয়। তিনি তাঁর জ্যোতির্বিদ ফতুল্লাহ সিরাজীকে প্রচলিত ইসলামিক ক্যালেন্ডারের চান্দ্র বছর এবং প্রচলিত হিন্দু ক্যালেন্ডারের সৌর বছর মিলিয়ে একটি নূতন ক্যালেন্ডার তৈরি করতে আদেশ দেন। ফলস্বরূপ, এই দুই ক্যালেন্ডার মিলিয়ে সিরাজী বাংলা ক্যালেন্ডারের প্রচলন করেন – ফসল তোলার মৌসুমের সাথে মিল থাকায় বছরের এই হিসাব ফসলী সন হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। অন্য সূত্র থেকে জানা যায় যে, নবাব মুরশীদ কুলি খান, যিনি মুঘল আমলে একজন রাজ্যপাল (Governor) ছিলেন, তিনিই সর্বপ্রথম ভূমির খাজনা আদায়ের জন্য পহেলা বৈশাখে পূণ্যাহ অনুষ্ঠানের প্রবরতন করেন এবং আকবরের রাজস্ব নীতি বাস্তবায়নে বাংলা ক্যালেন্ডার অনুসরণ করেন।
আবার কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে সপ্তম শতকে রাজা শশাংকের রাজত্বকালে দুটি শিব মন্দিরে বঙ্গাব্দ শব্দটি খচিত দেখতে পাওয়া যায়। এতে প্রতীয়মান হয় যে আকবরের শাসনামলেরও অনেক আগে বাংলা বছরের প্রচলন ছিল।
পাঁচ
এদেশে পহেলা বৈশাখ এলেই চারিদিকে সাজ সাজ রব পড়ে যায়। এলাকা ভিত্তিক নানা আয়োজনের ছোঁয়ায় মুখরিত থাকে মানুষ। এমন এক সময় ছিল যখন বাংলা বছরের প্রথম দিনে কৃষক পরিবারগুলো প্রথা হিসেবে ‘আমানী’ পালন করতো এই ভাবনা থেকে যেন সারা বছর পরিবারের সকলে ভালো থাকে এবং জমিতে ফসল যেন ভাল হয়। পহেলা বৈশাখে রাজশাহী ও চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার সুবিখ্যাত গম্ভীরা গানের আসর হয় যেখানে সমাজের নানা অসঙ্গতি তুলে ধরা হয় হাস্যরসাতœকভাবে। চট্টগ্রামে হয় জব্বারের বলি খেলা – ১২ বৈশাখে – লাল দীঘি ময়দানে। কুষ্টিয়াতে হয় লাঠি খেলা, মুন্সীগঞ্জ ও মানিকগঞ্জে হয় গরুর গাড়ীর দৌড় প্রতিযোগিতা, নেত্রকোনায় হয় ষাড়ের লড়াই, ব্রাহ্মনবাড়ীয়ায় হয় মোরগ লড়াই এবং অন্যান্য অঞ্চলে রঙ-বেরং-এর নানা আয়োজন থাকে।
বৃহৎ পরিসরে বৈশাখী উৎসবের তিনটি উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান হলো – পূণ্যহা, হালখাতা ও মেলা। পূণ্যহা মূলত একটি পবিত্র দিন হিসেবে বিবেচিত হয়। এই দিনে বাংলার জমিদাররা কৃষককুলের কাছ থেকে জমির খাজনা আদায় করত জমিদার বাড়ী ও কাচারী নানাভাবে সাজানো হতো। জমিদারেরা প্রজাকুলের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন, মিষ্টিমুখ করাতেন। পান-সুপারী খেতে দিতেন জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হবার সাথে সাথে পূন্যহা পালন করাও বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে এই রেওয়াজ চালু রয়েছে শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামে। আদিবাসী রাজা আনন্দঘন উৎসবমুখর পরিবেশে এই অনুষ্ঠান পালন করেন।
পহেলা বৈশাখে দেশব্যাপী পালিত হতো ‘হালখাতা’। এটি যেন পুণ্যাহা উৎসবের আরেকটি দিক যেখানে বিশেষ করে পল্লী এলাকার ব্যবসায়ীরা আয়োজন করত হালখাতার। বাংলাদেশে ব্যবসায়ীদের জন্য এটি ছিল অপরিহার্য একটি আয়োজন। আমাদের সমাজ ছিল কৃষি নির্ভর – প্রায় আশি ভাগ মানুষ কৃষির আয়ের ওপরে ভিত্তি করে জীবন নিরবাহ করতো। মৌসুম ভিত্তিক উৎপাদিত ফসল বিক্রী করে যে আয় হয় তা দিয়েই যাবতীয় ব্যয় নির্বাহ করতে হতো – ফলে দৈনন্দিন চাহিদা মেটাবার জন্য নানা পণ্য বাকীতে কেনা ছাড়া উপায় থাকতো না। তাঁরা মৌসুম অনুযায়ী যে ধান, পাট চাষ করতো – তা বিক্রী করে নগদ যে টাকা পেত তা দিয়ে পরের মৌসুমের চাষের জন্য ব্যয় হত; মহাজন/দোকানের বাকী মেটাতে ব্যয় হতো আয়ের বড় আরেক অংশ। ফলে সব পরিশোধ করে হাতে যে সামান্য টাকা থাকতো তা দিয়ে সংসার চালানো সহজ ছিল না। ফলে আবার বাকীতে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা-কাটা করতে হতো এবং একই সাথে হাত পাততে হতো মহাজনের কাছে। এভাবেই চলতে হতো সারা বছর]। সে কারণে গ্রামীন সমাজে হালখাতা ছিল এক অতি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন যেখানে গ্রামের মানুষ তাদের সারা বছরের বাকী শোধ করে নূতন বছরে নূতনভাবে জীবন শুরু করতে চাইতো। তাই হালখাতা তাদের জন্য ছিল একাধারে আনন্দজনক, তৃপ্তিদায়ী এবং মর্যাদাকর।
পহেলা বৈশাখে বাজারের ব্যবসায়ীরা আনন্দঘন পরিবেশে ক্রেতা ও ঋণ পরিশোধকারীদের মিষ্টিমুখ করাতেন। তাঁরা তাদের ব্যবসা কেন্দ্র/ব্যবসা ঘরকে নানা ফেষ্টুন ও ফুল দিয়ে সাজাতেন। বাকী শোধ করতে দলে দলে গ্রামের মানুষেরা ছেলে-মেয়েদের নিয়ে বাজারে আসতেন। এতো বাকী শোধ নয়, যেন এক উৎসবের দিন! বাজারে এসে দেখা হতো একজনের সাথে আরেকজনের। সব ধর্মের মানুষ একে অপরের সাথে কুশল ও শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন। এভাবেই চিরচেনা গ্রামের সকলে তাদের বিগত দিনের সকল মলিনতা, গ্লানি ধুয়ে শুচি, শুভ্র নব দিনের সুচনা করতেন। তবে সময়ান্তে আমাদের দেশের মানুষের আয় বেড়েছে এবং নগদ অর্থে পণ্য কেনার সবলতা তাঁদের তৈরী হয়েছে, ফলে গ্রামীন সমাজে হালখাতা এ’র গুরুত্ব হারিয়েছে।।
প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে বৈশাখী মেলা ছিল বৈশাখী উৎসবের এক অপরিহার্য বিশেষ অংশ। এই দিনে গ্রামে-গঞ্জে-শহরে-নগরে এই মেলা হয়। মাটির পুতুল, কাঠের খেলনা, পুতির গয়না, কাঁচের চুড়ি, বাঁশের বাঁশি, কুলা আরো কত পসরা সাজিয়ে বসে মেলা। দুর-দূরান্ত থেকে সব বয়সের নরনারী এসে ভিড়তো সেখানে। এ এক মিলন মেলা। এভাবেই বাংলা নববর্ষ উদযাপন অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়ার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে পাকিস্তান পর্বের সাম্প্রদায়িক নানা উস্কানীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার সাহস যুগিয়েছে। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানবাসী হিসেবে আমাদের সইতে হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর নানা ধরণের অনাচার। এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় বাংলার বুদ্ধিজীবী-সংস্কৃতিসেবী-পেশাজীবী সকলেই। তাদের নেতিবাচক মানসিকতা নিবৃত্ত করতে পরিষ্কার করে জানানো হয়েছে যে এই উৎসবের মধ্যে কোন হিন্দুয়ানী নেই, বরং মুঘল স¤্রাট আকবরের হুকুমে ভারতে বাংলা নববর্ষ পালনের রীতি শুরু হয়। এই ধারণাটির প্রচলন করা হয় ইরানের নূতন বছর পালনের উৎসব ‘নওরোজ’ থেকে। ফলে এই রীতির মূল অনৈসলামিক নয়। পাকিস্তানী সামরিক শাসকেরা এই যুক্তিকে মেনে নিতে পারেনি। উল্টো সামরিক শাসকেরা ১৯৬৭ সালে রবীন্দ্র সঙ্গীত নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কেন্দ্রীয় সরকারের এহেন বিমাতাসুলভ আচরণে দেশবাসী ফুঁসে ওঠে। এর ফলে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে রাজনীতির ঢেউ লাগে। একই বছরে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গড়ে ওঠে ছায়ানট। পহেলা বৈশাখে রমনার বটমূলে ছায়ানট অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই হুকুমের বিরোধিতা করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। সেই ধারাবাহিকতায় আজো ছায়ানট রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ বরণ করে আসছে। আশার কথা – দেশের গন্ডি পেরিয়ে ইংল্যান্ড, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ দেশে দেশে ছড়িয়ে গেছে এই উৎসব। বিশ্বব্যাপী প্রবাসে বসবাসরত এদেশের মানুষের গড়ে ওঠা সমাজ যেন একেকটি ক্ষুদ্র বাংলাদেশ যেখানে বাংলা নববর্ষ পালিত হয় অসাম্প্রদায়িক চেতনাবোধের দ্যুতি ছড়িয়ে।

Top