রাত ৪:৫৭
আগামী মাস থেকে এলএনজির সরবরাহ শুরু: নসরুল হামিদআম নয়, আঁটির উপকারিতা জেনে নিনদিল্লির নেতৃত্ব ছাড়লেন গৌতম গম্ভীরইউটিউব দেখে পার্সেল বোমা বানানো সেই শিক্ষক গ্রেফতারতারেকের বাংলাদেশি নাগরিকত্ব নেই : আইনমন্ত্রীছাত্রীকে এসিড ছোড়ার মামলায় একজনের যাবজ্জীবনপাসপোর্ট নিতে হলে অবশ্যই দেশে আসতে হবেতিনদিনের সফরে অস্ট্রেলিয়া পথে প্রধানমন্ত্রীরাষ্ট্রপতির টুঙ্গিপাড়া সফর স্থগিতবড়পুকুরিয়া কয়লাখনি শ্রমিক ও ক্ষতিগ্রস্তদের সংবাদ সম্মেলন

পহেলা বৈশাখ, বাঙ্গালীদের সার্বজনীন উৎসবঃ শুভ নববর্ষ

প্রথমকথা ডেস্ক:
স্বাগত পহেলা বৈশাখ !!!
এসো হে বৈশাখ এসো এসো্,
তাপসনিশ্বসবায়ে, মুমূর্ষুরে দায় উড়ায়ে,
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক।
এসো, এসো হে বৈশাখ এসো এসো্।
পহেলা বৈশাখ, বাঙ্গালীদের সার্বজনীন উৎসবঃ শুভ নববর্ষ, স্বাগত ১৪২৫বঙ্গাব্দ ।
নিশি অবসান প্রায় ঐ পুরাতন বর্ষ হয় গত,
আমি আজি ধূলিতলে জীর্ণ জীবন করিলাম নত।
বন্ধু হও শত্রু হও যেখানে যে রও, ক্ষমা কর আজিকার মত,
পুরাতন বরষের সাথে পুরাতা অপরাধ যত।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই প্রার্থনার মধ্যে দিয়ে শুরু হোক পয়লা বৈশাখ বা পহেলা বৈশাখ।

উৎসব মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণের প্রকাশ। উৎসব কখনো একা একা হয় না, করা যায় না। সেটা একটা সম্মিলিত অংশগ্রহণের মাধ্যমেই ঘটে। আর তা মানুষের সম্মিলনের একটা উপলক্ষও বটে। যে মানুষরা উৎসব করে তারা একই ধরনের বিষয়ে আনন্দিত হয়, সাধারণ কিছু আচরণ, প্রথা তৈরি করে। তার মাধ্যমে একটা সাধারণ অভিজ্ঞতার ভাগাভাগি ঘটে। আর সম্প্রদায় বা জাতি গঠনের ক্ষেত্রে এই সাধারণ অভিজ্ঞতার ভূমিকা বিপুল। দুনিয়ার বহু দেশেই একটা সাধারণ উৎসব হলো নববর্ষ। যা পুরনো বছরের হিসাব মেলানো আর নতুন বছরটা যাতে ভালো কাটে তার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশে গ্রামেগঞ্জে এ উৎসব বহুকাল থেকেই পালিত হয়ে আসছে মেলা আর হালখাতা হিসেবে। পাহাড়ে এই উৎসবের নাম বৈসাবি। আর পুরো উৎসবের সঙ্গেই যেহেতু ভালো খাওয়া-দাওয়ার একটা সম্পর্ক থাকে, বৈশাখই বা তা থেকে বাদ যাবে কেন? হালখাতার সময় দই, মিষ্টি খাওয়ানোটা ছিল রেওয়াজ। বাড়িতে বাড়িতে হতো পায়েস, মাংস, মাছের বিশেষ পদ। খাওয়া হতো তরমুজ, বাঙ্গি ইত্যাদি মৌসুমি ফল। মেলায় থাকত নানা রকম মিষ্টান্ন, ভেঁপু, বাঁশি, টেপা পুতুল, চুড়ি, ফিতা, লুঙ্গি, গামছা, শাড়ি, চরকি, বেলুন, কাগজের ফুলসহ স্থানীয় বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী হরেক রকম পণ্য। থাকত গান, পালা, ম্যাজিকসহ সাংস্কৃতিক আয়োজন। দিন শেষে মানুষ আনন্দ নিয়ে ঘরে ফিরত। এ ধরনের আয়োজন বাংলাদেশের সর্বত্রই প্রায় হতো। ঢাকাও সেদিক থেকে কোনো ব্যতিক্রম ছিল না। ঢাকাতেও স্বতঃস্ফূর্ত এই উৎসব হতো নানা আয়োজনে। কিন্তু এ ধরনের উৎসবকে আসলে বলা যায় নৃগোষ্ঠীর উৎসব, একে জাতীয় হয়ে উঠতে হলে আসলে একটা সংগঠিত আয়োজন লাগে। কিন্তু তা যাতে উৎসবের স্বতঃস্ফূর্ততাকে নষ্ট না করে, যেসব আয়োজন প্রথাগতভাবে স্থানীয় মানুষ-প্রকৃতির মেলবন্ধনে তৈরি হয়েছে তাকে নতুন আয়োজনের ভিত্তি হিসেবে ধরে তাকে যাতে নবায়িত করতে পারে সেটা নিশ্চিত করাও জরুরি। সেটা করা গেলেই তা জাতীয় ঐতিহ্য হয়ে ওঠে।


ঢাকায় সংগঠিতভাবে পহেলা বৈশাখ পালন শুরু হয় পাকিস্তান আমলের শুরুর দিক থেকেই। ভাষাসৈনিক আহমদ রফিকের লেখা থেকে জানা যায়, ‘পাকিস্তানি আমলের শুরুতেই ঢাকায় বাংলা নববর্ষের উদ্‌যাপন ছিল দ্বিধাজড়িত পদে। এর কারণ রাজনৈতিক-সামাজিক, অংশত ধর্মীয় চেতনার প্রভাবে। পাকিস্তানি শাসকদের বড় অপছন্দের ছিল বাঙালিয়ানা ও তার সাংস্কৃতিক প্রকাশ। তা ছাড়া শিক্ষিত বাঙালি মুসলমানের বড়সড় অংশে পাকিস্তানি চেতনার প্রভাব তখন যথেষ্ট।
পাকিস্তানি চেতনার বিরূপ পরিবেশেই ঢাকায় পঞ্চাশের দশক থেকে আটপৌরে রূপ নিয়ে বৈশাখী নববর্ষের যাত্রা। দু-একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন সাহস করে বৈশাখী নববর্ষকে আনুষ্ঠানিক রূপে প্রকাশের চেষ্টা চালিয়েছে। যেমন ১৯৫১ সালে ঢাকার ‘লেখক শিল্পী মজলিশ’ আমন্ত্রণপত্র ছেপে ‘শুভ নববর্ষ’ উদ্‌যাপনের আয়োজন করেছিল। বেশ ঘটা করে পালিত হয় পহেলা বৈশাখ। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি ও কবিতা আবৃত্তির মতো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বর্ষ শুরুর জমজমাট উদ্‌যাপন। ঢাকা বেতারের জনাকয়েক সংগীতশিল্পী এতে অংশ নিয়েছিলেন কিছুটা ঝুঁকি নিয়ে।
১৯৫৪ সাল এদিক থেকে নানারূপে নিজেকে দেখতে চেষ্টা করেছে আত্মচেতনার প্রকাশ ঘটিয়ে। ওই বছর যেমন শহর ঢাকায় নববর্ষের জমজমাট উদ্‌যাপন (যুক্তফ্রন্টের মুখ্যমন্ত্রী আবুল কাসেম ফজলুল হক সাহেবের অসাধারণ একটি অভিনন্দনমূলক বৈশাখী ভাষণ স্মর্তব্য), তেমনি দেশের সর্বত্র বিশেষ করে জেলা শহরগুলোতে বৈশাখী উদ্‌যাপন ছিল লক্ষ্য করার মতো। সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক বিচারে ১৯৫৪ সাল ছিল একধরনের দিকনির্দেশক, অসাধারণ একখণ্ড সময়। প্রবল আবেগ-উদ্দীপনা নিয়ে ওই বছর উদ্যাপিত হয়েছিল পহেলা বৈশাখ তার নানামাত্রিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে।
রমনার অশ্বত্থতলায় ১৯৬৭ সালে ছায়ানটের বৈশাখী বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা এবং পরবর্তীকালে এর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা উল্লেখ করার মতো। ওই সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল গণসংস্কৃতির প্রকাশ। ‘ক্রান্তি’ নামক গণসংস্কৃতি সংগঠনের জনপ্রিয় যাত্রাও বিশেষ ঘটনা। আর সত্তরের দশকে রমনার অশ্বত্থতলার আবেগ দ্রুতবেগে এগিয়ে চারুকলার বকুলতলায় গিয়ে ঠাঁই নেয়, যা রাজনৈতিক ভিন্ন বাঁকফেরা সত্ত্বেও বৈশাখী
আবেগের প্রকাশে পিছু হটে না। এখনো হটেনি। পহেলা বৈশাখে ঢাকার রাজপথে মানুষের ঢল ও নানা চরিত্রের সংগঠনের উপস্থিতি তেমনই প্রমাণ দেয়। ’
ঐতিহ্যের সঙ্গে, পূর্বপুরুষের স্মৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক জোর করে নাই করে দেওয়া যায় না, পাকিস্তানি শাসকরাও তা পারেনি। বাংলাদেশ হওয়ার পর এই উদ্‌যাপন ক্রমশ বিস্মৃত হয়েছে। চারুকলায় বর্ষবরণের শোভাযাত্রা একে নতুন রূপ দিয়েছে। কিন্তু একটা দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, যে গ্রাম এই উৎসবের সূতিকাগার সেখানে এই উৎসব ক্রমশ ক্ষীণ হতে হতে হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতির রক্তশূন্যতা নিশ্চয়ই এর একটি বড় কারণ। অর্থাৎ যে জাতীয় বিকাশ আমাদের হচ্ছে সেখানে এই সংস্কৃতির উৎস গ্রামসমাজই বাদ পড়ে যাচ্ছে। এই অর্থনৈতিক বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে পহেলা বৈশাখের সংগঠিত আয়োজন আমাদের মানুষের জীবন ও প্রকৃতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে বিকশিত হয়েছে কি না, সে প্রশ্নও এসে পড়ে। যেমন পহেলা বৈশাখের খাবার হিসেবে পান্তা-ইলিশ খাবার চল হয়েছে। পান্তা বাঙালি খাবার, ইলিশও তা-ই। কিন্তু সেটা পহেলা বৈশাখের খাবার হতে পারে না, কেননা এটা ইলিশ ধরার মৌসুম না, আর যদি ইলিশ বাজারে পাওয়াও যায় তার দাম হবে আকাশছোঁয়া, যা সাধারণের নাগালের বাইরে। ফলে উৎসবের খাবারই তার সর্বজনীন হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এভাবে ঢাকার উৎসব আর জাতীয় উৎসব না হয়ে মধ্য শ্রেণির বিশেষ অংশের উৎসবে পরিণত হচ্ছে।
কিন্তু জাতীয় সংস্কৃতি গড়তে হলে জাতীয় উৎসব লাগবে। আর গ্রাম শহর সর্বত্রই তার সমসত্ত্বতা না হোক সামঞ্জস্য তো লাগবেই। সে ক্ষেত্রে গ্রামের ওপর সেটা চাপিয়ে দিলে চলবে না, বরং শাসক নগরকেই তার দায় নিতে হবে। আর সর্বজনীন, অসাম্প্রদায়িক উৎসব হিসেবে পহেলা বৈশাখের চেয়ে ভালো বিকল্প আমাদের হাতে নাই। ঢাকার পহেলা বৈশাখ যদি গোটা দেশকে ধারণ করতে পারে কেবল তাহলেই তা জাতীয় সংস্কৃতি হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: অনলাইন

Top