সকাল ৬:৫২
12-12-2017Issueওয়ান প্লানেট শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে প্যারিসের পথে প্রধানমন্ত্রীশহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের অপহরণ দিবস আজটাঙ্গাইল হানাদার মুক্ত দিবস আজরাষ্ট্রপতি ওআইসির সম্মেলনে যাচ্ছেন আজওয়ান প্লানেট শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে প্যারিসের পথে প্রধানমন্ত্রী11-12-2017Issueনিরাপত্তা ঝুকির চিঠি উপেক্ষাঃ উত্তরা নাটোর টাওয়ারে ভয়াবহ অগুন10-12-2017 issueবিজয় দিবস উদযাপন উপলক্ষে আশুলিয়ায় স্বেচ্ছাসেবক লীগের যৌথ আলোচনা সভা

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবীতে উত্তাল সেই গণআদালত এর দিনগুলি

যেসব নরপশুর বিচার হচ্ছে, ফাঁসি কার্যকর হচ্ছে, সেটার বীজ বপিত হয়েছিলো জননী জাহানারা ইমামের পবিত্র হাতে। আসুন সুমন জাহিদের লেখায় সে সময়ে ফিরে যাই।

কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী গোলাম আজম গংদের বিরুদ্ধে গোটা জাতি ফুঁসে উঠেছিলো শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে। সরকার যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবীকে অগ্রাহ্য করছিলো তখন ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ডাকে ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো গণআদালত।

সমস্ত দেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকেরা জড়ো হয়েছিলো ঢাকায়। জামায়াত শিবিরও জড়ো করেছিলো তাদের ক্যাডার বাহিনী। আগের রাতেই সরকার ১৪৪ ধারা জারী করেছিলো। গোলাম আজমকে নিরাপত্তা হেফাজতে নিয়ে রক্ষা করেছিলো তৎকালীন সরকার! আর জাহানারা ইমামসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে গণআদালত গঠনের অপরাধে রাষ্ট্রদ্রোহীতার মামলা করা হয়!
কিন্তু তবু থামেনি জনতা। ৫ লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে সেদিন বিচারে গোলাম আযমের অপরাধকে মৃত্যুদণ্ডাদেশযোগ্য ঘোষণা করে সরকারের কাছে আবেদন জানানো হয় তা কার্যকরের।

Image may contain: 6 people, people smiling, people standing

সেই দিনের সেই আন্দোলন আর গণআদালতের ছবি তুলেছিলেন তৎকালীন রাজনৈতিক কর্মী এবং সাংবাদিক মনজুরুল আজিম পলাশ। এখন তিনি আছেন, লন্ডনে। কিন্তু এখনো দেশ আর মানুষের জন্য কাজ করে চলছেন নিরলস।
পলাশ ভাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে রাখি। এই ছবিগুলো এক একটা ইতিহাস। আসুন দেখি ঐতিহাসিক সেই গণ আদালতে কারা ছিলেন এবং কী রায় হয়েছিলো।

গণআদালতের সদস্যবৃন্দ:

১. জাহানারা ইমাম, চেয়ারম্যান, গণআদালত
২. গাজীউল হক, এডভোকেট সদস্য, গণআদালত
৩. ডঃ আহমদ শরীফ, এডভোকেট সদস্য, গণআদালত
৪. স্থপতি মাজহারুল ইসলাম, এডভোকেট সদস্য, গণআদালত
৫. ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, এডভোকেট সদস্য, গণআদালত
৬. ফয়েজ আহমদ, এডভোকেট সদস্য, গণআদালত
৭. কবীর চৌধুরী, এডভোকেট সদস্য, গণআদালত
৮. কলিম শরাফী, এডভোকেট সদস্য, গণআদালত
৯. মওলানা আবদুল আওয়াল, এডভোকেট সদস্য, গণআদালত
১০. লে. কর্ণেল (অব.) কাজী নুরুজ্জামান, এডভোকেট সদস্য, গণআদালত
১১. লে. কর্ণেল (অব.) আবু ওসমান চৌধুরী, এডভোকেট সদস্য, গণআদালত

গণআদালত মোকদ্দমা নং ১/১৯৯২

বাংলাদেশের গণমানুষ, অভিযোগকারী
বনাম
জনাব গোলাম আযম
পিতা : মওলানা গোলাম কবির
সাকিন : পাকিস্তান

বর্তমান অবস্থান: ১১৯, কাজী অফিস লেন, মগবাজার, থানা: রমনা, জেলা: ঢাকা, অভিযুক্ত ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী কর্তৃক গণহত্যা, লুন্ঠন, অগ্নিসংযোগ, জনপদ ধ্বংস, নারী ধর্ষণ প্রভৃতি অপরাধজনক কাজে মদদকারী এবং স্বয়ং শান্তি কমিটি, আল বদর, আল শামস বাহিনী গঠন করে এবং হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীকে রাজাকার বাহিনী গঠন করায় প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করে গণহত্যা, লুন্ঠন, অগ্নিসংযোগ, জনপদ হত্যার নীলনকশা প্রণয়ন করে, নিজস্ব বাহিনী আল বদর, আল শামস দিয়ে তাদের হত্যা করানো এবং মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালে ‘পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি” গঠন করে বিদেশী শত্রুর চর হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে অপরাধ সংগঠনের অভিযোগে অভিযুক্ত।

অভিযোগকারীর পক্ষে কৌসলিবৃন্দ :
১. এডভোকেট জেড আই পান্না
২.এডভোকেট শামসুদ্দিন বাবুল
৩. এডভোকেট উম্মে কুলসুম রেখা
অভিযুক্তের পক্ষে গণআদালত নিযুক্তীয় কৌসুলী :
১. এডভোকেট মো. নজরুল ইসলাম

রায়:

বাংলাদেশের গণমানুষের পক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, কবি শামসুল হক, ড. আনিসুজ্জামানের উত্থাপিত অভিযোগের ভিত্তিতে অত্র গণআদালতে এই মোকাদ্দমার সূত্রপাত:

অভিযোগের বিবরণে প্রকাশ, জনাব গোলাম আযম, পিতা মরহুম মওলানা গোলাম কবির একজন পাকিস্তানী নাগরিক। বহুদিন ধরে অবৈধভাবে বাংলাদেশে, ঢাকা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের অন্তর্গত মগবাজার এলাকায় ১১৯ নম্বর কাজী অফিস লেনে অবস্থানরত। গোলাম আযম ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বাংলাদেশে হানাদার তথা দখলদার বাহিনীকে সর্বোতভাবে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে ত্রিশ লক্ষ নিরীহ নিরস্ত্র নারী, পুরুষ ও শিশু হত্যা এবং দুই লক্ষ নারী অপহরণ ও ধর্ষনের সহায়তা করে যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতা বিরোধী অপরাধ করেছেন।

উক্ত সময়ে তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে শান্তি কমিটি, আল বদর, আল শামস গঠন করে তাদের এবং তার অনুগত রাজাকার বাহিনী দিয়ে সাহায্য করে পাকিস্তানী বাহিনী কর্তৃক দুই লক্ষ নারীকে অপহরন, ধর্ষণ এবং শ্লীলতাহানিতে প্ররোচিত করে হীন অপরাধ সংগঠন করিয়েছেন, উক্ত সময়ে তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে তার অনুগত আল বদর, আল শামস এবং রাজাকার বাহিনীকে নির্দেশ দিয়ে ব্যাপক গণহত্যা সংঘটিত করিয়েছেন এবং হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীকে গণহত্যার উস্কানি, প্ররোচণা এবং সাহায্য দান করেছেন এবং তার উক্ত কার্যের ফলে বাংলাদেশের ত্রিশ লক্ষ নারী, পুরুষ ও শিশু নিহত হয়েছে, উক্ত সময়ে অভিযুক্ত গোলাম আযম তার গঠিত ও অনুগত আল বদর, আল শামস ও শান্তি কমিটি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে লিপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিরীহ পরিবার পরিজনের উপর সশস্ত্র ধ্বংসযজ্ঞ অভিযান পরিচালনা করে, উক্ত সময়ে অভিযুক্ত গোলাম আযম বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যে বিদ্বেষ ও সহিংসতা ছড়ানোর লক্ষ্যে ধর্মের বিকৃত ব্যাখ্যা প্রদান করে ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ধর্মের নামে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করে এবং এই দেশের শিল্প-সাংস্কৃতিকে ধ্বংস করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয় এবং আজো এই দেশের শিল্প-সংস্কৃতিকে বিকৃত করা এবং শিক্ষা শিল্প ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রসমূহ ধ্বংস করার অপচেষ্টায় লিপ্ত করেছে, অভিযুক্ত গোলাম আযম ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে পাকিস্তানের এজেন্ট হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি গঠন করে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান না করার জন্য বিদেশী দেশসমূহকে প্ররোচিত করে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়, অভিযুক্ত গোলাম আযম বিদেশী নাগরিক হয়ে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংবিধান বিরোধী ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচার চালিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে।

Image may contain: 7 people, people standing and night

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের পর অভিযুক্ত গোলাম আযম তার নিজস্ব অনুগত বাহিনী আল বদর, আল শামস এবং রাজাকার বাহিনী দিয়ে লুটতরাজ এবং নিরস্ত্র নিরীহ মানুষের ঘরে অগ্নিসংযোগ করে অসংখ্য জনপদ ধ্বংস করেছে, ১৯৭১ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর সঙ্গে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত করে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবিদের অপহরণ ও হত্যা করে মানবতাবিরোধী জঘন্য অপরাধ সংঘটন করে।

উপরোক্ত অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযুক্ত গোলাম আযমের বিরুদ্ধে ১২(বার)টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রচনা করা হয়। গণআদালতের বিচারে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে অনুপস্থিত থাকায় ন্যায় বিচারের জন্য অভিযুক্ত গোলাম আযমের পক্ষে এডভোকেট মো. নজরুল ইসলামকে গণআদালত কৌসুলি নিযুক্ত করেন এবং গোলাম আযমের পক্ষে নিযুক্ত কৌসুলিকে অভিযোগ সমূহ পাঠ করে শোনান। অভিযুক্ত গোলাম আযমের পক্ষে নিযুক্ত কৌসুলি তার মক্কেল গোলাম আযমকে নির্দোষ বলে দাবি করেন।

বিচার্য বিষয়সমূহ:

১. অভিযুক্ত গোলাম আযম কি ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করে ত্রিশ লাখ নারী, পুরুষ ও শিশু হত্যা এবং দু’লাখ নারী অপহরন ও ধর্ষণের সহায়তা করে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন?

২. অভিযুক্ত গোলাম আযম কি ২৬ মার্চ থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে আল বদর, আল শামস গঠন করে এবং তার অনুগত রাজাকার বাহিনী দিয়ে পাকিস্তানী বাহিনীকে দু’লাখ নারী অপহরণ এবং ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানিজনক অপরাধ সংঘটন করতে সাহায্য করেছেন?

৩. অভিযুক্ত গোলাম আযম কি পাকিস্তানী বাহিনীকে গণহত্যার উস্কানি এবং প্ররোচনা দান করেছেন?

৪.অভিযুক্ত গোলাম আযম কি আলবদর, আলশামস বাহিনী গঠন করে তাদের দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে লিপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিরীহ পরিবার পরিজনের উপর সশস্ত্র ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালনা করেছেন?

৫. অভিযুক্ত গোলাম আযম কি বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যে বিদ্বেষ এবং সহিংসতা ছড়ানোর লক্ষ্যে ধর্মের নামে বিকৃত ব্যাখ্যা প্রদান করে ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ধর্মের নামে লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে এবং এই দেশের শিল্প-সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে?

৬. অভিযুক্ত গোলাম আযম কি তার নিজস্ব অনুগত বাহিনী আল বদর, আল শামস ও রাজাকার বাহিনী দিয়ে লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ করে অসংখ্য জনপদ ধ্বংস করে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করেছেন?

৭. অভিযুক্ত গোলাম আযম কি পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর সঙ্গে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত করে এই দেশে ১৯৭১ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে তার অনুগত বাহিনী আলবদর ও আলশামস দিয়ে বুদ্ধিজীবি হত্যা সংঘটন করেছেন?

৮. অভিযুক্ত গোলাম আযম কি ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি গঠন করে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীনতার বিরুদ্ধে চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র করেছে?

৯. অভিযুক্ত গোলাম আযম কি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচারকার্য চালিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন?

১০. অভিযুক্ত গোলাম আযম কি স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে তার অনুগত আলবদর, আলশামস বাহিনী এবং রাজাকার বাহিনী দিয়ে বাংলাদেশে ব্যাপক গণহত্যা চালিয়ে জঘন্যতম মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন?

বিচার্য বিষয়সমূহের পর্যালোচনা এবং সিদ্ধান্ত:

বিচারের সুবিধার্থে সমস্ত বিচার্যবিষয়সমূহ একসঙ্গে পর্যালোচনা করা হলো। গণআদালতে এই মোকদ্দমায় পক্ষ মোকদ্দমা প্রদানের জন্য মোট ১৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। ফরিয়াদী পক্ষের ১ নং সাক্ষী ড. আনিসুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক। তিনি তার লিখিত জবানবন্দিতে বলেন যে, অভিযুক্ত গোলাম আযম ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর প্রতিটি অন্যায়, বেআইনি, অমানবিক ও নিষ্ঠুর কাজকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেছে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের দেশদ্রোহী বলে আখ্যায়িত করার প্ররোচনা দিয়েছিলেন এবং তার প্ররোচনায় দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের আলবদর এবং আলশামসবাহিনী হত্যা করে। এই সাক্ষী তার সাক্ষ্যে আরো বলেন যে, অভিযুক্ত গোলাম আযম ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭৮ সালের ১০ জুলাই পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সশরীরে উপস্থিত থেকে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে মুদ্রিত ও প্রকাশিত প্রচারপত্র ও প্রবন্ধের মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে দূর্বল সহায়হীন, বিচ্ছিন্ন ও বিনষ্ট করার যড়যন্ত্র করেছে। ড. আনিসুজ্জামান মৌখিক সাক্ষ্যের সমর্থনে গোলাম আযমের মুদ্রিত ও প্রকাশিত বিভিন্ন বক্তৃতা, বিবৃতি, প্রচারপত্র এবং প্রবন্ধসমূহ দলিলরূপে গণআদালতে দাখিল ও প্রমাণ করেন। (গণআদালত প্রদর্শনীপর্ব)

ফরিয়াদী পক্ষের দ্বিতীয় সাক্ষী ড. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক। তিনি তার লিখিত জবানবন্দিতে ১ নং সাক্ষী ড. আনিসুজ্জামানের বক্তব্যকে পুরোপুরি সমর্থন করেন। তিনি তার সাক্ষ্যে বলেন, গোলাম আযম পূর্ব পাকিস্তান জামাতে ইসলামীর আমির হিসেবে হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীকে গণহত্যা, নারীধর্ষণ, লুণ্ঠন এবং জনপদ ধ্বংসের কাজে সহায়তা দান করেছে। ড. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর তার বক্তব্যের সমর্থনে দৈনিক পূর্বদেশ ৫ এপ্রিল, ২৭ জুন (গণআদালত প্রদর্শনী খ পর্ব), দৈনিক পাকিস্তান ১৬ এপ্রিল, ২০ এপ্রিল, ১৬ আগষ্ট, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২৪ নভেম্বর, ১৯ জুন, ২১ জুন, ১৯ আগস্ট, ১৭ সেপ্টেম্বর সংখ্যা সমূহ (গণআদালতে প্রদর্শনী গ পর্ব), দৈনিক আজাদ ২১ জুন (গণআদালতে প্রদর্শনী ঘ পর্ব), দৈনিক সংগ্রাম ১৭ জুন, ২২জুন, ২১ জুন (গণআদালতে প্রদর্শনী ঙ পর্ব), আদালতে প্রমাণ করেন।

ফরিয়াদী পক্ষের ৩ নং সাক্ষী ড. মেঘনাগুহঠাকুরতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের শিক্ষক। তিনি তার জবানবন্দীতে ড. আনিসুজ্জামান এবং ড. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরকে পুরোপুরি সমর্থন করেন।

ফরিয়াদী পক্ষের ৪র্থ সাক্ষী সৈয়দ শামসুল হক বাংলাদেশের বিখ্যাত উপন্যাসিক, কবি এবং নাট্যকার। তিনি তার লিখিত জবানবন্দীতে ফরিয়াদী পক্ষের ১ নং এবং ২ নং সাক্ষীকে পুরোপুরি সমর্থন করেন। তিনি তার সাক্ষ্যে বলেন গোলাম আযম মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশের দীর্ঘ ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে সক্রিয় ছিলো। তিনি তার সাক্ষ্যে আরো বলেন, গোলাম আযম পাকিস্তানী বাহিনীর সঙ্গে সক্রিয় সহযোগিতা করে, মদদ দান করে বাঙালী জাতিকে সর্ব অর্থে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে নীলনকশা প্রণয়ন করে। তিনি আরো বলেন, গোলাম আযম বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের যে ধর্মবিশ্বাস সেই ইসলামের বিকৃত ব্যাখ্যা করেছে। মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাকামী মানুষের ওপর অমানুষিক নির্যাতন করেছে এবং লাখ লাখ মানুষের প্রাণ হরণ করেছে। তিনি গোলাম আযম কর্তৃক কার্যকে হিটলারের নাৎসী বাহিনীর অমানবিক পৈশাচিক কার্যের সঙ্গে তুলনা করেন, সৈয়দ শামসুল হক তার সাক্ষ্যে ১/২/৩ নং সাক্ষীকে পুরোপুরি সমর্থন করেন এবং বুদ্ধিজীবিদের হত্যার জন্য গোলাম আযমকে দায়ী করেন।

ফরিয়াদী পক্ষের ৫ম সাক্ষী শাহরিয়ার কবির একজন খ্যাতনামা সাংবাদিক ও সাহিত্যিক। তিনি তার জবানবন্দীতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদ ও নাৎসীদের অনুসরনের অভিযোগ উত্থাপন করে বলেন, গোলাম আযমের নেতৃত্বে জামাতে ইসলাম ফ্যাসিস্ট দর্শনের অনুসারী হয়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে ব্যাপক গণহত্যা চালিয়েছে। পাকিস্তানী সামরিক জান্তাকে নানাভাবে প্ররোচিত করে গণহত্যাযজ্ঞ ঘটিয়েছে। গোলাম আযমের পক্ষে তাকে জেরা করা হয় কিন্তু তিনি তার সাক্ষ্যে অবিচল থাকেন।
ফরিয়াদী পক্ষের ৬ষ্ঠ সাক্ষী মুশতারী শফী বাংলাদেশের খ্যাতনাম লেখিকা। তিনি তার জবানবন্দীতে ফরিয়াদী বাদে ১-৫ নং সাক্ষীদের বক্তব্য পুরোপুরি সমর্থন করেন।

ফরিয়াদী পক্ষের ৭ম সাক্ষী সাইদুর রহমান শহীদ প্রকৌশলী ফজলুর রহমানের পুত্র। ১৯৭১ সালের ১৫ এপ্রিল পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী এবং গোলাম আযমের জামাতে ইসলামের দলীয় লোকগণ তার বাবা, মা ও তিন বড় ভাইকে গুলি করে এবং বেয়নেট চার্জ করে হত্যা করে। সে তার জবানবন্দিতে গোলাম আযমকে হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর সহায়তাকারী হিসেবে অভিযুক্ত করেন।
অভিযুক্ত গোলাম আযমের কৌসুলি তাকে কোনো জেরা করেন না।

ফরিয়াদী পক্ষের ৮ম সাক্ষী অমিতাভ কায়সার বিখ্যাত সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সারের পুত্র। সে তার জবানবন্দীতে ডিসেম্বর মাসের ১৪ তারিখে গোলাম আযমের নেতৃত্বে পরিচালিত আল বদর বাহিনীর সদস্য এবিএম খালেক মজুমদার (বর্তমানে জামাতে ইসলামীর সদস্য) এবং আরো কয়েকজন সশস্ত্র আলবদর শহীদুল্লাহ কায়সারকে বাড়ি থেকে হত্যার উদ্দেশ্যে বলপূর্বক অপহরণ করে নিয়ে যায়। শহীদুল্লাহ কায়সার আর ফিরে আসেননি। পিতার অপহরণ এবং হত্যার জন্য অমিতাভ কায়সার গোলাম আযমকে এবং তার নেতৃত্বে গঠিত আল বদর বাহিনী এবং জামাতে ইসলামী দলকে দায়ী করে।

ফরিয়াদী পক্ষের ৯ম সাক্ষী হামিদা বানু মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী গোলাম আযমের পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতায় এই দেশের দু’লক্ষ নারীকে অপহরণ ও ধর্ষণ এবং শ্লীলতাহানী করে এই সম্পর্কে সাক্ষ্য প্রদান করেন। তিনি তার অভিযোগে দু’লক্ষ মহিলার ওপর পাশবিক নির্যাতনের জন্য এবং নারী হত্যার জন্য এবং গণহত্যার জন্য গোলাম আযমকে হানাদার বাহিনীর সহায়তাকারী হিসেবে অভিযুক্ত করেন।

ফরিয়াদী পক্ষের ১০ নং সাক্ষী মাওলানা ইয়াহিয়া মাহমুদ তার সাক্ষ্যে পবিত্র ইসলাম ধর্মের বিকৃত ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য গোলাম আযম এবং তার দল জামাতে ইসলামকে দায়ী করেন এবং এই দেশে গণহত্যা, মুক্তিযোদ্ধা হত্যা এবং অগ্নিসংযোগ, জনপদ ধ্বংসের জন্য গোলাম আযমকে অভিযুক্ত করেন এবং আলেম সমাজের পক্ষ থেকে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
ফরিয়াদী পক্ষের ১১ নং সাক্ষী জনাব আলী যাকের বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবি হত্যার নীলনকশা প্রণয়নকারী হিসেবে গোলাম আযমকে অভিযুক্ত করে সাক্ষ্য প্রদান করেন। তিনি তার বক্তব্যের সমর্থনে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর সঙ্গে গোলাম আযমের গোপন বৈঠকের একটি আলোকচিত্র প্রদর্শন করেন। (গণআদালত প্রদর্শনী পর্ব)

ফরিয়াদী পক্ষের ১২ নং সাক্ষী ডা. মুশতাক হোসেন ‘৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধকালে বাংলাদেশের ডাক্তারদের হত্যা করার জন্য গোলাম আযম সহায়তা দিয়েছেন বলে সাক্ষ্য প্রদান করেন।

ফরিয়াদী পক্ষের ১৩ নং সাক্ষী মোঃ সুমন জাহিদ, মা: মুক্তিযোদ্ধা শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন এবং ফরিয়াদী পক্ষের ১৪ নং সাক্ষী বাবুল চন্দ্র দে, বাবা: মধুর চন্দ্র দে অন্যান্য সাক্ষীদের সমর্থন করেন।

গণআদালত উপরে বর্ণিত সাক্ষ্য প্রমানাদি সঠিকভাবে পর্যালোচনা করে ১-৬ এবং ৯-১২ নং সাক্ষীগণ পন্ডিত এবং সমাজের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি ৭,৮,১৩ ও ১৫ নং সাক্ষীগণ শহীদ পিতা/মাতার পুত্র। তাদের সাক্ষ্য এত সহজ-সরল এবং এমন প্রত্যয়ী যে, তাদের সাক্ষ্য বিন্দুমাত্র সন্দেহের উদ্রেক করে না। আমরা সাক্ষীদ্বয় প্রদত্ত সাক্ষ্য সত্য এবং দাখিলকৃত প্রদর্শনীসমূহ অকাট্য বিবেচনা করের সর্বসম্মতভাবে অভিযুক্ত গোলাম আযমের বিরুদ্ধে প্রতিটি অভিযোগ প্রমাণ হয়েছে বলে মনে করি এবং আনীত প্রতিটি অভিযোগের প্রত্যেক অপরাধে তাকে দোষী সাব্যস্ত করছি। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সমস্ত গণতান্ত্রিক দেশে উপরোক্ত অপরাধ দৃষ্টান্তমূলক মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ।

যেহেতু গণআদালত কোনো দণ্ডাদেশ কার্যকর করে না, সেহেতু অভিযুক্ত গোলাম আযমকে আমরা দোষী সাব্যস্ত করে তার বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের নিকট অনুরোধ জানাচ্ছি।

২৬ মার্চ, ১৯৯২
…………………………………………………………………………
গণআদালতের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য এসেছিলেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দল। এদের মধ্যে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের এটর্নি টমাস কিটিং। তিনি বলেছিলেন, “যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের গণ-আদালতে বিচারের সময় যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফুর্ত জনতার বিশাল সমাবেশ পৃথিবীর একটি বিরল দৃষ্টান্ত।”

আগেই বলেছি, এই রায় কার্যকর হয়নি। তৎকালীন বিএনপি সরকার গোলামকে নিরাপত্তা হেফাজত দিয়ে গণআদালতকারীদের রাষ্ট্রদ্রোহী ঘোষণা করে চূড়ান্ত হয়রানী করেছে!

এই গণ আদালত ঠেকাতে তৎকালীন সরকারের চেষ্টার কোনো কমতি ছিলো না। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সেদিন সকাল থেকে সব গেট বন্ধ করে দেয়া হয় এবং বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও বিডিআর মোতায়েন করা হয়। বেলা ১২টার দিকে জনতার স্রোত বন্ধ গেট ভেঙ্গে ভিতরে প্রবেশ করে। কিছুক্ষণ পর জনতার ঢল দেখে পুলিশ, বিডিআর এলাকা ত্যাগ করে। অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও শৃঙ্খলার মধ্যে গোলাম আযমের বিচার কাজ চলে।

গণ-আদালত গঠন এবং তার সামনে জনধিকৃত গণশত্রুর বিচার এ ভূখন্ডে নতুন এবং অভিনব হলেও এর নজির আছে। ভিয়েতনামে মার্কিনীদের আগ্রাসনকে কেন্দ্র করে লর্ড বার্টান্ড রাসেলের নেতৃত্বে একটি গণ-আদালত হয়। সেখানে ওই যুদ্ধে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়। পরে রোমে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয় ইন্টারন্যাশনাল পিপলস ট্রাইব্যুনাল নামে। এই ট্রাইব্যুনাল পরে ভুপালে গ্যাস ট্র্যাজেডিতে যে গণহত্যা হয়েছিল তার বিচার করেছিল। ভিয়েতনামে অরেঞ্জ এসিড রেইনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচার করে।

২৬ এপ্রিল ১৯৯২ বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে লক্ষাধিক মানুষের জনসমাবেশে জাহানারা ইমাম গণআন্দোলনের ৪ দফা ঘোষণা করেন। তিনি দাবী জানিয়েছিলেন গণ-আদালতের রায় কার্যকর করার এবং জামাত-শিবিরের ধর্ম-ভিত্তিক সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বন্ধ করার। গণ-আদালতের উদ্যোক্তা জাহানারা ইমামসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা করা হয়েছিল। এই মামলা প্রত্যাহার ও জাতীয় সমন্বয় কমিটির নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে পুলিশী হযরানি বন্ধ করার দাবীও জানানো হয়েছিল। কিন্তু শহীদ জননী জাহানারা ইমাম মৃত্যুবরণ করেন রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা নিয়ে !!
বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম আগের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি সোচ্চার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবীতে।

১১ জন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত এই গণআদালতের পঞ্চম বিচারক ব্যরিস্টার শফিক আহমেদ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণ আদালতের পর পর এই আন্দোলনের সঙ্গে সহমত ঘোষণা করে বলেছিলেন বুকের রক্ত দিয়ে হলেও তিনি এদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবেন। আমরা কৃতজ্ঞ তিনি তা করছেন।

আমরা জানি বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছে প্রধানত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েই। সে প্রতিশ্রুতি তাঁরা রক্ষা করেছেন এখন পর্যন্ত।
গণহত্যার পরিকল্পনাকারী, সহায়তাকারী, অংশগ্রহণকারী, খুনি, ধর্ষক, লুঠেরা সকল যুদ্ধাপরাধীর, ফাসির রায় কার্যকর হবার আশায়… আমরা অপেক্ষায় আছি…… আমরা অপেক্ষায় আছি… আমরা অপেক্ষায় আছি… আমরা অপেক্ষায় আছি…

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা ‘শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন’ এর সন্তান।

Top